ব্রহ্মপুত্রের তীররক্ষা বাঁধে ধস ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলছে পাউবো
রওশন বাবু,রংপুর, প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীররক্ষা বাঁধে ধস ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধে প্রকল্প শেষ হওয়ার এক বছরের মধ্যেই ধস দেখা দেওয়ায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নদপাড়ের বাসিন্দারা। তারা ৪৪৮ কোটি ৩১ লাখ টাকার তীররক্ষা প্রকল্পের কাজের মান, নকশা এবং বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পাশাপাশি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও নদীভাঙন থেকে চিলমারী ও উলিপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ রক্ষায় ৪৪৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর সংরক্ষণে ‘চিলমারী প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করা হয়। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ ২০২৫ সালে শেষ হয়। প্রকল্পের আওতায় ৬ দশমিক ৩০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৫৭ দশমিক ৫০ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, এক কিলোমিটার বিকল্প বাঁধ নির্মাণ এবং আট ভেন্টবিশিষ্ট একটি রেগুলেটর নির্মাণ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বুধবার গভীর রাতে চিলমারী উপজেলার কাচকোল ও সড়কটারী এলাকায় নবনির্মিত ডান তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ১৫০ মিটার অংশে ধস দেখা দেয়। ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় বাঁধের কংক্রিট (সিসি) ব্লকের একটি অংশ। এতে চিলমারী শহরসহ আশপাশের জনপদে বন্যা ও নদীভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং শুক্রবার বিকেল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, আপাতত দেড় হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। প্রতিটি জিও ব্যাগে প্রায় ২৫০ কেজি করে বালু ভরা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১২ হাজার জিও ব্যাগ ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, “বাঁধ রক্ষায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এটি শুধু ব্রহ্মপুত্রের ডান তীররক্ষা বাঁধ নয়, চিলমারী শহর রক্ষারও প্রধান প্রতিরক্ষা বাঁধ। তাই পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।”
সড়কটারী এলাকার কৃষক আকবর আলী (৬৫) বলেন, সরকার বিপুল অর্থ ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ করেছে। অথচ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার এক বছরের মধ্যেই ধস দেখা দিয়েছে। এতে নির্মাণকাজের মান নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, “এত বড় প্রকল্পে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও অনিয়ম হয়েছে। সরকার যদি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে, তাহলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।”
কাচকোল গ্রামের বাসিন্দা সহিদুল ইসলাম (৫৫) বলেন, এবার এখনো ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপৎসীমাও অতিক্রম করেনি। বড় ধরনের বন্যা ছাড়াই যদি নতুন বাঁধে ধস দেখা দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে নদীর পানি বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
তার অভিযোগ, নিম্নমানের জিও টেক্সটাইল এবং নিম্নমানের পাথর ও সিমেন্ট ব্যবহার করে কংক্রিট ব্লক নির্মাণ করায় বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে প্রকল্পে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান।
তিনি বলেন, “প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে নদীপাড়ের হাজারো মানুষ এখন নিরাপদে বসবাস করছেন। যে স্থানে ধস দেখা দিয়েছে, সেখানে মূলত নকশাগত সীমাবদ্ধতা ছিল। ওই অংশে ৫০ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার নকশা করা হয়েছিল এবং ঠিকাদার সেই নকশা অনুযায়ীই কাজ সম্পন্ন করেছে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ৮০ থেকে ১০০ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার কাঠামো প্রয়োজন ছিল।”
তিনি আরও জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আগামী শুষ্ক মৌসুমে নতুন নকশা প্রণয়ন করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে স্থায়ীভাবে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।