নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম মিরপুর কলেজ। শুরু থেকে দেশের শিক্ষা বিস্তরে অসামান্য অবদান রেখে চলছিল প্রতিষ্ঠান টি। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই প্রতিষ্ঠান টি একটি ব্যবসায়ী ও দলবাজ সিন্ডিকেটের দখলে। খোঁজ নিয়ে জানা যায় মিরপুর কলেজের ইসলাম শিক্ষার সহযোগী অধ্যাপক মো. মহসিন আলী মিরপুর মেডিসিন কর্ণারের মালিক, একই প্রতিষ্ঠানের আরও কয়েকজন ব্যবসা বানিজ্যের সাথে জরিত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ জারিকৃত নীতিমালায় ১১.১৭ ধারায় উল্লেখ আছে যে এমপিও ভুক্ত কোন শিক্ষক- কর্মচারী একই সাথে একাধিক কোন পদে চাকরি বা আর্থিক লাভজনক কোন পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। এটি প্রমানিত হলে তার বা তাদের এমপিও বাতিল করা হবে এবং বিধি মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ পরিপত্র বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদশন করেই তারা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের আর্থিক লাভজনক প্রতিষ্ঠান।
এদিকে মিরপুর কলেজের ১৭তম গভর্নিং বডির পঞ্চম সভায় ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও মেডিসিন ব্যবসায়ী মহসিন আলীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়। অভিযোগে উল্লেখ করা হয় যে, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য মহোদয়কে উদ্দেশ্য করে এমন একটি মন্তব্য/পোস্ট প্রদান করেন, যা উপাচার্য মহোদয়ের ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতার পরিপন্থী, অশোভন এবং অগ্রহণযোগ্য।
উক্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়। কিন্তু তিনি যে জবাব দাখিল করেন তা কর্তৃপক্ষের নিকট সন্তোষজনক বিবেচিত হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিষয়টি গুরুতর হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর প্রশাসনিক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গকে উৎসাহিত করার সামিল।
এদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শবনম জাহানের বিরুদ্ধেও গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করেছেন কলেজের শিক্ষার্থীরা । তারা বলেন, তিনি স্বৈরাচারের আমলে দীর্ঘ প্রায় সাত বছর বিভাগীয় চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকার পরেও ৫ আগষ্টের পট পরিবর্তনের পর প্রাতিষ্ঠানের বিধিবিধান উপেক্ষা করে বিভাগীয় প্রধানের পদ দখল করে আছেন। এখনো বিভাগীয় প্রধানের চেয়ার জোরপূর্বক দখল করে আছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পতিত স্বৈরাচারের আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের পাওয়ার দেখিয়ে শবনম জাহান কয়েকবার শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশগ্রহণ করে দুইবার মিরপুর থানার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছে। কলেজের অন্য কোন শিক্ষক আবেদন করতে চাইলে তাদের চাকরি থেকে বহিষ্কার করা সহ শারীরিক ও মানসিক নানা রকম নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছে ।
কলেজের বেশিরভাগ শিক্ষক অভিযোগ করেন এই মহসিন শবনম সিন্ডিকেট ছুটির দিনে কলেজে এসে এমন কি রাতের আঁধারে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ফাইল ঘাটাঘাটি করেন আর এ কাজে সহযোগিতা করেন সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল আহাম্মদ আলী।
এদিকে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায় এই সিন্ডিকেট ক্লাস নেওয়ার চেয়ে দলবাজী আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাজ কর্ম নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত থাকে যে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রনয়ণ করার সময়ও পাইনা। অতিসম্প্রতি কলেজের টেস্ট পরীক্ষায় ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের প্রশ্নপত্র হাতে নি দেখা যায় এটা প্রি-টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হুবহু তুলে ধরা হয়েছে এবং পৌরনীতি ও সুশাসন ২য় পত্রের প্রশ্নে শবনম জাহান ২০২৩ সালের সিলেট বোর্ডের প্রশ্নপত্র কপি-পেস্ট করে চালিয়ে দিয়েছেন। অথচ মাত্র কয়েকদিন আগেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নোটিশ পাবলিস্ট না করে একক ভাবে তিনি শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়ে তার অনুগামী কয়েকজন শিক্ষক নিয়ে কলেজে ভুরিভোজের আয়োজন করেন।
এদিক থেকে ফিনান্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাফিজ আল আসাদ আরও একধার এগিয়ে তিনি পতিত স্বৈরাচারের আমলে তার স্ত্রীকেও মার্কেটিং বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ দিয়েছেন।
মিরপুর কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান এরা বেশিরভাগ সময় তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যায় করেন আর বাকীটা সময় ক্লাস ফাঁকি দিয়ে শিক্ষক মিলনায়তনে চলে অনুসারীদের নিয়ে খাওয়া দাওয়া ও আড্ডা। প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষক আরও ভয়ংকর অভিযোগ করেন মহসিন আলী গংদের বিরুদ্ধে, তাদের অভিযোগ মিরপুর থানা জামাতের রোকন আহাম্মেদ আলীকে ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপালের দায়িত্বে বসিয়ে শিক্ষকদের গোপনীয় ফাইল ঘাটাঘাটি করে অনেক শিক্ষকের নিয়োগ পরীক্ষার নম্বর শিটে ঘষামাজা করে চাকরি খাওয়ার হুমকি দিতেন। মিরপুর কলেজের এই মহসিন শবনম সিন্ডিকেটের কথার বাহিরে গেলে বা তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললেই শিক্ষকদের উপর নেমে আসতো ভয়াবহ নির্যাতন। অতিসম্প্রতি কলেজের অনার্স শাখায় জাতীয় বিশ্বিবদ্যালয়ের অনুমতিক্রমে সমস্ত বিধি বিধান মেনে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের কাছে এই চক্রটি অর্থ দাবি করে না পাওয়ায় কলেজের প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সপাল ও সভপতির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে নিয়োগ বাতিলের আবেদন করেন কিন্তু এই সিন্ডকেট টাকার বিনিময়ে নিয়মনীতির তুয়াক্কা না করে ১৩ বছর আগের সার্কুলারে বিবিএ প্রফেশনাল বিষয়ে একজন শিক্ষক নিয়োগ দিতে বাধ্য করেছেন বলে জানা গেছে। শিক্ষকরা আরও জানান, তাদের বিরুদ্ধে আরও বিভিন্ন অনিয়ম, অপকর্ম ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর বিষয় কলেজে আলোচিত, যা প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাকে ব্যাহত করছে।
উপরোক্ত দুই শিক্ষকের কর্মকাণ্ড সম্মিলিতভাবে কলেজে বিভাজন, অস্থিরতা, ভীতি ও প্রশাসনিক স্থবিরতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যা একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং শিক্ষা-সংক্রান্ত আইন, আচরণবিধি ও শৃঙ্খলা নীতিমালার পরিপন্থি।
মিরপুর কলেজের সাধারন শিক্ষক শিক্ষার্থীরা এই ভয়াবহ সিন্ডিকেটের হাত থেকে তাদের প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কে রক্ষা করার জন্য দেশের সচেতন নাগরিক ও সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তারা চান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে মিরপুর কলেজ দেশের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে।
