নিজস্ব সংবাদদাতা -মাইনুল ইসলাম ইমন
১৪৪ ঘণ্টা পার হলেও ছিনতাইকৃত মালামাল উদ্ধার হয়নি, প্রাণনাশের আশঙ্কা
নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলায় নদী দখল ও অবৈধ মাছ আহরণকে কেন্দ্র করে দুই সাংবাদিকের ওপর হামলা, ছিনতাই ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার ১৪৪ ঘণ্টারও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত ছিনতাইকৃত মোবাইল ফোন, প্রেস আইডি কার্ড ও নগদ অর্থ উদ্ধার হয়নি। এ ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের প্রাণনাশের আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে।
ঘটনাটি কেন্দুয়া উপজেলার মোজাফফরপুর ইউনিয়নের হারুলিয়া ও চারিতলা গ্রামে রাজি নদী এলাকায় সংঘটিত হয়।
ঘটনার বিবরণ
অভিযোগ অনুযায়ী, মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী নদীতে সেচ দিয়ে মাছ ধরার প্রস্তুতি নেয়। কেন্দুয়া থানার সার্কেল অফিসারের নির্দেশে তথ্য সংগ্রহের জন্য ঘটনাস্থলে যান সাংবাদিক সালমান আহমেদ ও তার ভাই সাংবাদিক রিজুয়ান আহমেদ।
ভুক্তভোগীদের দাবি, সেখানে উপস্থিত হয়ে তারা ভিডিওচিত্র ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করলে অভিযুক্তরা তাদের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীদের মধ্যে হাজী লিটন (আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক), বাবলু মাস্টার (বিএনপি নেতা) ও পাবেলসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের মারধর করে তাদের কাছ থেকে—
দুটি মোবাইল ফোন
জাতীয় দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশ পত্রিকার প্রেস আইডি কার্ড
মানিব্যাগ ও নগদ অর্থ
ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে তাদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
প্রাণনাশের আশঙ্কা
স্থানীয় এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ক্ষুব্ধ অবস্থায় রয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, “এই দুই সাংবাদিককে মেরে ফেলারও আশঙ্কা রয়েছে।”
তবে এ বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। ভুক্তভোগীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন।
১৪৪ ঘণ্টা পার, তবু নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি
ঘটনার পর থানায় জিডি দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা কেন্দুয়া থানার ওসি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নেত্রকোনা জেলার পুলিশ সুপার এবং কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সভাপতির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
এছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নেত্রকোনা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গেও মুঠোফোনে কথা হয়েছে বলে জানা গেছে। তিনি বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ছিনতাইকৃত মালামাল উদ্ধার বা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য পাওয়া যায়নি।
শতকোটি টাকার ভাগাভাগির অভিযোগ
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ অভিযোগ করেছেন, রাজি নদী ও সরকারি খাস জমি দখলকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের দাবি, নদী থেকে অবৈধভাবে সেচ দিয়ে মাছ আহরণের মাধ্যমে প্রায় শত কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রশাসনের একাংশের মধ্যে ভাগাভাগি হওয়ার কথা রয়েছে। থানার নীরব ভূমিকার পেছনে আর্থিক সমঝোতা থাকতে পারে বলেও এলাকাবাসীর আশঙ্কা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন,
“নদী থেকে শত কোটি টাকার মাছ উঠবে। উপরের দিক পর্যন্ত ভাগ ঠিক আছে বলেই কেউ কিছু করছে না।”
যদিও এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
জনমনে আতঙ্ক ও ক্ষোভ
স্থানীয়দের অভিযোগ, থানায় অভিযোগ করলে ভুক্তভোগীরা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে বলে বেড়ায়— “থানায় গিয়েছিস? থানা আমাদের কিছু করতে পারবে না।” এ ধরনের বক্তব্য এলাকায় ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি করেছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের পরিবার বর্তমানে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্ন
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও প্রেস আইডি কার্ড ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়া হলে অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা আড়াল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি
স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত দাবি করেছেন। তারা—
ছিনতাইকৃত মালামাল দ্রুত উদ্ধার
জড়িতদের আইনের আওতায় আনা
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত
নদী দখল ও অবৈধ মাছ আহরণের অভিযোগে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন
—এই দাবিগুলো জানিয়েছেন।
প্রশাসনের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপই পারে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে— এমনটাই মনে করছেন এলাকাবাসী।
