মোঃ জানে আলম রনি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি।
সাংবাদিকতা সমাজের দর্পণ এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটি আদর্শ সমাজে সাংবাদিকদের কলম হয় শোষিতের হাতিয়ার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে এই মহান পেশার আড়ালে একশ্রেণির সুবিধাবাদী ও নীতিহীন মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যারা সাংবাদিকতাকে পরিণত করেছে নিজেদের আখের গোছানোর হাতিয়ারে।
সুবিধাবাদীদের দৌরাত্ম্য ও অবৈধ বাণিজ্য
মাঠপর্যায়ে খবর সংগ্রহের চেয়ে একশ্রেণির তথাকথিত সাংবাদিক আজ বেশি ব্যস্ত ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ এবং তদবিরে। সরকারি ও বেসরকারি বড় বড় দপ্তরে খবরের সন্ধানে যাওয়ার নাম করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা এদের মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং কর্তাব্যক্তিদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে অবৈধ আয়ের পথ সুগম করাই এদের প্রধান লক্ষ্য। সাংবাদিকতার মতো একটি পবিত্র পেশাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা ব্ল্যাকমেইলিং ও চাঁদাবাজির এক নীরব সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। সাংবাদিক সমাজের কাছে এই ‘তেলবাজ’ বা চাটুকার শ্রেণিটি আজ এক চরম ‘অ্যালার্জি’ বা বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে।
সাংবাদিক সংগঠনের অবক্ষয় ও সহকর্মীদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা
সবচেয়ে হতাশার ও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সুবিধাবাদী নেতারাই অনেক সময় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর শীর্ষ পদগুলো দখল করে বসে থাকে। যাদের দায়িত্ব ছিল সাংবাদিকদের অধিকার আদায় ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, তারাই অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের কাছে নিজেদের সহকর্মীদের তথ্য বিক্রি করে দেয়। মাঠে কাজ করা প্রিন্ট, অনলাইন বা মাল্টিমিডিয়ার কোনো সাধারণ সাংবাদিক যদি কখনো জেনে বা না জেনে সামান্য ভুল করে বসেন, তবে এই নেতারাই সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে সবার আগে তাকে ‘ভুয়া সাংবাদিক’ তকমা দিয়ে বিবৃতি প্রদানে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে এবং প্রশাসনের কাছে ভালো সাজতে তারা নিজ সম্প্রদায়ের মানুষদেরই বলির পাঁঠা বানাতে দ্বিধা করেন না।
প্রকৃত সাংবাদিক বনাম মুখোশধারীদের জীবনযাত্রা
আজ সাংবাদিকতায় এক অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর বৈষম্য দৃশ্যমান। যারা সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করে দুর্নীতি ও চাটুকারিতা করছেন, সমাজে তাদের বাড়ি-গাড়ির কোনো অভাব নেই। অবৈধ উপার্জনে তারা বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। অন্যদিকে, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন—সেই প্রকৃত সাংবাদিকদের জীবনে না আছে বাড়ি, না আছে গাড়ি। মাস শেষে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার এক নিরন্তর ও নীরব সংগ্রাম চালিয়ে যান এই আসল কলমসৈনিকেরা।
উত্তরণের উপায় ও আমাদের প্রত্যাশা
সাংবাদিকতার এই ক্রান্তিলগ্ন থেকে উত্তরণ এখন সময়ের দাবি। এই পেশাকে কলঙ্কমুক্ত করতে হলে সবার আগে সাংবাদিকদের নিজেদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সংগঠনগুলোতে যেন কোনোভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত, চাটুকার ও ধান্দাবাজরা নেতৃত্ব দিতে না পারে, সে বিষয়ে সাধারণ সাংবাদিকদের সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। প্রশাসন ও সমাজের সাধারণ মানুষ সাবধানে পর্যবেক্ষণ করলেই বুঝতে পারবেন—কারা প্রকৃত সাংবাদিক আর কারা সাংবাদিকতার লেবাসে চাঁদাবাজ।
যাঁরা লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে শত অভাব-অনটনের মাঝেও সততা ও নিষ্ঠার সাথে সাংবাদিকতা করে যাচ্ছেন, তাঁদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা। এই প্রকৃত কলমসৈনিকদের হাত ধরেই সাংবাদিকতার হারানো গৌরব আবারও ফিরে আসবে—এটাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
