তেলের সংকট নেই, রেশনিং পদ্ধতিতে সরবরাহ : জ্বালানি মন্ত্রী
নিরাপত্তা জোরদার, অতিরিক্ত দাম আদায়ে মোবাইল কোর্টের নির্দেশ
মো.আমিরুল ইসলাম:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আতঙ্কে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পগুলোতে গ্রাহকদের ভিড় বেড়েছে। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহনের চালকরা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে আবার তেল না পেয়ে ফিরতে হচ্ছে চালকদের।
হঠাৎ সৃষ্ট এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু সিএনজি, পাঠাও ও উবার চালক যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে আতঙ্কে অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করতে পাম্পে ভিড় করছেন।
মন্ত্রীর বক্তব্য
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে, তেলের কোনো সংকট নেই। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার সতর্কতামূলকভাবে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল সরবরাহ করছে।
সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন,
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মজুত তেল সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহারের জন্য সরকার রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছে।
মন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ কতদিন চলবে তা নিশ্চিত নয়। তাই একসঙ্গে সব জ্বালানি ব্যবহার না করে পরিকল্পিতভাবে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে সমুদ্রে থাকা কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ যাতে নির্বিঘ্নে দেশে আসতে পারে সে বিষয়ে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে যোগাযোগের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।
তেল আমদানির উদ্যোগ
জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় (ডিপিএম) প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল কেনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, মার্চ ও এপ্রিল মাসের জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিয়েছে।
বিপিসির বক্তব্য
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)-এর চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, অনেকেই অতিরিক্ত তেল মজুত করার চেষ্টা করছেন। এ কারণে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে একটি ট্যাংকার চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় পৌঁছেছে। আগামী এক সপ্তাহে আরও চারটি ট্যাংকার আসবে, যাতে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার টন ডিজেল রয়েছে।
চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী—
দেশের জ্বালানি চাহিদার ৯৫-১০০ শতাংশ আমদানিনির্ভর
দৈনিক অকটেন চাহিদা প্রায় ১১০০ মেট্রিক টন
বর্তমানে আমদানি হচ্ছে প্রায় ৭৫০-৮০০ মেট্রিক টন
দেশে ডিজেলের স্বাভাবিক চাহিদা মাসে প্রায় ১২ হাজার টন।
রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সরবরাহ
বিপিসির নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী—
মোটরসাইকেল: সর্বোচ্চ ২ লিটার
প্রাইভেট কার: ১০ লিটার
এসইউভি/মাইক্রোবাস: ২০-২৫ লিটার
পিকআপ ও লোকাল বাস: ৭০-৮০ লিটার ডিজেল
দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক: ২০০-২২০ লিটার ডিজেল
পাম্পে ভোগান্তি
রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।
রামপুরার এক মোটরসাইকেল চালক আনোয়ারুল বলেন,
“তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে মাত্র তিন লিটার তেল পেয়েছি।”
উবার চালক রহিম শেখ জানান,
গুলশানের কয়েকটি পাম্পে ঘুরেও তেল পাননি। পরে রামপুরায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
এদিকে আগারগাঁও থেকে হাতিরঝিল আসা যাত্রী রাকিব বলেন,
“আগে ১৫০ টাকায় আসতাম, এখন ২৫০ টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে।”
কেন এই পরিস্থিতি
পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম বলেন, ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় অনেক পাম্পে সরবরাহ কমে গেছে।
তিনি বলেন, জাহাজ বন্দরে পৌঁছালেও পাম্প পর্যন্ত তেল আসতে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। এই বিষয়টি সাধারণ মানুষ না বোঝায় আতঙ্কে পাম্পে ভিড় বাড়ছে।
অতিরিক্ত দাম রোধে মোবাইল কোর্ট
সরকার জানিয়েছে, সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
নিরাপত্তা জোরদার
সম্প্রতি ঝিনাইদহে তেল নেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনার পর সারাদেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।
বিপিসি জানিয়েছে, পাম্প এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। রাজধানীর অনেক পাম্পে র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীকেও টহল দিতে দেখা গেছে।
