ডা: কাজি সোহেল রানা,
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ভোটের মাঠে উত্তেজনা ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বড় দুটি রাজনৈতিক দল ও জোটের শীর্ষ নেতা–প্রার্থীদের বক্তব্যে নির্বাচনী পরিবেশ আর শান্তিপূর্ণ থাকছে না। মহান মুক্তিযুদ্ধ, নারীর অধিকার, চাঁদাবাজি ও বিদেশে অর্থপাচারসহ নানা ইস্যু নিয়ে নেতাদের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি কথার লড়াই।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের নেতা–প্রার্থীরা প্রচারণায় পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন এবং জাতীয়–স্থানীয় ইস্যুতে জড়িয়ে পড়ছেন বাগযুদ্ধে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ ধরনের অমার্জিত আচরণ চলতে থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হবে। তারা সবাইকে সংযত ভাষা ব্যবহার ও আক্রমণাত্মক আচরণ পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
শেষ মুহূর্তেও বাড়ছে উত্তেজনা
নির্বাচনের আর মাত্র তিন দিন বাকি। ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রচার চালানোর সুযোগ থাকলেও শেষ সময়ে প্রতিশ্রুতির চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণই বেশি দেখা যাচ্ছে, যা নির্বাচনী আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। নির্বাচন কমিশন কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রার্থীদের সীমাহীন আচরণ আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর প্রভাবে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতাও ঘটছে। গত কয়েক দিনে নওগাঁ, কুষ্টিয়া ও ভোলায় বিএনপি–জামায়াত সংঘর্ষে প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
সংসদ নির্বাচনের রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা–২০২৫-এর ১৫(ক) ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারকালে কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগত কুৎসা, অশালীন বা আক্রমণাত্মক বক্তব্য এবং চরিত্রহনন করতে পারবেন না। তিক্ত, উসকানিমূলক কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে—এমন বক্তব্যও নিষিদ্ধ। অথচ প্রধান দলগুলোর নেতা–প্রার্থীরা এ বিধি ভঙ্গ করলেও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুল রহমানেল মাছউদ বলেন,
“ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আমরা শতাধিক মামলা করেছি এবং প্রায় ৪০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছি। কিন্তু আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে শৃঙ্খলা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আসেনি।”
জামায়াত প্রসঙ্গে বিএনপির কঠোর অবস্থান
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাম্প্রতিক জনসভাগুলোতে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন,
“দেশের মানুষ জানে, তারা কীভাবে হত্যা–নির্যাতনে জড়িত ছিল। যারা নিজেদের মা–বোনের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তারা দেশের নিরাপত্তা দেবে কীভাবে?”
বিএনপির কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, জামায়াত ভোটারদের বিকাশ ও এনআইডি নম্বর সংগ্রহ করে বিভ্রান্ত করছে এবং ধর্মীয় আবেগ কাজে লাগিয়ে ভোট চাইছে। জামায়াত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
৪ ফেব্রুয়ারি বরিশালে এক জনসভায় তারেক রহমান বলেন,
“একটি গুপ্ত পরিচয়ের দল নতুন জালেমরূপে আবির্ভূত হয়েছে। তারা নারীদের নিয়ে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
৩১ জানুয়ারি জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্টে নারীদের নিয়ে বিতর্কিত পোস্ট ভাইরাল হলে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। পরে জামায়াত দাবি করে, অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ভুয়া বার্তা ছড়ানো হয়েছিল এবং এ ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,
“যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তাদের ওপর আস্থা রাখা যায় না। ধর্মের নামে রাজনীতি করলে দেশে তালেবানি ধাঁচের শাসনের ঝুঁকি তৈরি হবে।”
বিএনপিকে নিয়ে জামায়াতের পাল্টা আক্রমণ
জামায়াত নেতারাও বিএনপিকে চাঁদাবাজি ও দখলদারির রাজনীতির জন্য দায়ী করছেন। টাঙ্গাইলে এক জনসভায় জামায়াত আমির বলেন,
“যারা এতদিন মজলুম ছিল, তারাই এখন মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে, মামলা–বাণিজ্য ও দখলদারি করছে।”
এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, বিএনপি স্বৈরাচারের দোসর ও বিদেশে অর্থপাচারকারীর দল।
চাঁদপুরে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন,
“বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি—তিন দলই দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ। জনগণ এবার পরিবর্তন চায়।”
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন,
“প্রতিদ্বন্দ্বীকে হেয় করার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে গণতন্ত্র শক্ত ভিত পাবে না। দলগুলোকে গঠনমূলক রাজনীতিতে ফিরতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমানের মতে,
“এই কাদা–ছোড়াছুড়ি সহিংসতায় রূপ নিলে নির্বাচন কমিশনকে কঠোর হস্তক্ষেপ করতে হবে।”
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন,
“ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে ভোট টানার চেষ্টা বিপজ্জনক। এ বিষয়ে কমিশনের শক্ত অবস্থান জরুরি।”
