মোঃ আমিরুল ইসলাম:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩১টিই কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। জামায়াতে ইসলামীসহ এসব দল জুলাই সনদে অন্তত ৫ শতাংশ আসনে নারী মনোনয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি—যা নিয়ে নাগরিক সমাজে তীব্র সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ—প্রায় ৪৯ শতাংশ। অথচ ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ৭৬ জন, অর্থাৎ ৩.৮৪ শতাংশ। একজন হিজড়া প্রার্থীও রয়েছেন। বিশাল এই বৈষম্য গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর নির্দেশনা রয়েছে। জুলাই সনদেও রাজনৈতিক দলগুলো নারী মনোনয়ন বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ দল সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেনি।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন,
“এত বড় জনগোষ্ঠীকে বাইরে রেখে সংসদ কার্যকর হতে পারে না। ৩১টি দল একজন নারীও না দেওয়ায় বিষয়টি খুবই হতাশাজনক।”
নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়নবিষয়ক ৭১ সংগঠনের জোট সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি এক বিবৃতিতে বলেছে, “এটি প্রতিনিধিত্বের চরম ভারসাম্যহীন চিত্র। অধিকাংশ দল নারীদের রাজনীতি থেকে কার্যত বাদ দিয়েছে।”
কোন দলে কত নারী
দলীয়ভাবে ৬১ জন ও স্বতন্ত্র হিসেবে ১৫ জন নারী প্রার্থী হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ১০ জন করে নারী দিয়েছে বিএনপি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল–মার্কসবাদী। জাতীয় পার্টি ও জেএসডি ছয়জন করে, বাসদ ও ইনসানিয়াত বিপ্লব চারজন করে, গণসংহতি আন্দোলন ও গণঅধিকার পরিষদ তিনজন করে প্রার্থী দিয়েছে। বহু দল একজনের বেশি নারীকে মনোনয়ন দেয়নি।
জামায়াতের মহিলা শাখার সমন্বয়ক ডা. হাবিবা উম্মে চৌধুরী সুইট বলেন,
“এবার প্রস্তুতি কম ছিল। পরের নির্বাচনে অবশ্যই নারী প্রার্থী দেওয়া হবে।”
আগের তুলনায় অবনতি
২০২৪ সালের নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিলেন ১০১ জন—মোট প্রার্থীর ৫ শতাংশের বেশি। এবার সেই হার আরও কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধারাবাহিক অগ্রগতির বদলে পেছনে হাঁটার এই প্রবণতা উদ্বেগজনক।
প্রার্থীদের ক্ষোভ
ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন,
“নারী ভোটার প্রায় অর্ধেক হলেও প্রার্থী মাত্র ৭৬ জন—এটি নারীদের প্রতি অবমাননা। সংসদে নারী কণ্ঠ না বাড়লে তাদের সমস্যার সমাধান হবে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও আইনি বাধ্যবাধকতা—দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া এই সংকট কাটবে না।
