মোঃ নাহিদ ইসলাম (জয়) ক্রাইম রিপোর্টার নাটোরঃ
অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে বিক্রির স্বীকারোক্তির দাবি, মাদক নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থার আহ্বান এলাকাবাসীর
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় মাদক কারবারের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ক্ষোভ ও উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বড়াইগ্রাম উপজেলার ২নং বড়াইগ্রাম ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের বাগডোব গ্রামের মাহাতো পাড়া, স্থানীয়ভাবে পরিচিত বিল পাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে নিজ বাড়িতে বাংলা মদ উৎপাদন ও বিক্রির অভিযোগে এক নারীকে হাতে নাতে ধরার দাবি করেছেন এলাকাবাসী।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, শ্রী অঞ্জলী মাহাতো নামের ওই নারী দীর্ঘ সময় ধরে তার বসতবাড়ির ভেতরে অবৈধভাবে বাংলা মদ তৈরি করে আসছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় আলোচিত হলেও ভয়ে কিংবা নানা কারণে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। তবে সম্প্রতি মাদকের প্রভাবে এলাকায় কিশোর ও যুবকদের অবক্ষয়, বিশৃঙ্খলা ও সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিলে স্থানীয়রা সংগঠিতভাবে উদ্যোগ নেন।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হাতেনাতে ধরার দাবি
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার (২৯ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.) বিকেলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এলাকাবাসী অঞ্জলী মাহাতোর বাড়িতে গিয়ে তার মদ তৈরির ঘরে প্রবেশ করেন। এ সময় সেখানে বাংলা মদ তৈরির বিভিন্ন উপকরণ ও প্রস্তুত মদ পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়। স্থানীয়রা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মদ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে অঞ্জলী মাহাতো জানান—তিনি নিয়মিত বাংলা মদ তৈরি করেন এবং বিশেষ করে পূজার সময় এর চাহিদা ও বিক্রি বেড়ে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি আরও বলেন যে, মূলত কিশোর ও অল্প বয়সী ছেলেদের কাছেই তিনি বেশি মদ বিক্রি করেন। প্রতি ২৫০ মিলিলিটার মদের বোতল তিনি ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি করে থাকেন বলে স্থানীয়দের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
পারিবারিক পরিচয় ও অভিযোগের প্রেক্ষাপট
অভিযোগে আরও বলা হয়, অঞ্জলী মাহাতোর স্বামী প্রয়াত শ্রী সুরেন মাহাতো। তার ছেলে শ্রী অশোক মাহাতোও বিষয়টি জানতেন বলে এলাকাবাসীর একটি অংশ দাবি করেছে, যদিও এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের মতে, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বসবাস করে আসলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদক উৎপাদন ও বিক্রির কারণে এলাকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে।
একাধিক বাসিন্দা জানান, সন্ধ্যার পরপরই এলাকায় অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যেত। অনেক সময় কিশোর বয়সী ছেলেদের দলবেঁধে ওই বাড়ির আশপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত। বিষয়টি নিয়ে পরিবারগুলো উদ্বিগ্ন থাকলেও প্রমাণের অভাবে প্রকাশ্যে কেউ অভিযোগ করতে পারেননি।
যুবদল নেতার বক্তব্য
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ৬নং ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি মোঃ মোজাম্মেল হক বাটুল। তিনি সাংবাদিকদের বলেন,
“আমার এলাকাতে এই ধরনের মাদক কারবার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এগুলোর কারণে আমাদের যুব সমাজ ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছে। আজ যারা কিশোর, কাল তারাই বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়বে। আমি প্রশাসনের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি—এই এলাকায় যেন মাদক সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হয় এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজকে রক্ষা করতে হলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর তিনি জোর দেন।
এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
ঘটনার সময় সেখানে শ্রী সুদীপ কুমারসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় মাদক সমস্যার কারণে পারিবারিক অশান্তি, চুরি, মারামারি ও নানা সামাজিক ব্যাধি দেখা দিচ্ছে। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন, তাদের সন্তানরা ধীরে ধীরে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
একজন স্থানীয় অভিভাবক বলেন,
“আমরা চাই আমাদের সন্তানরা স্কুলে যাবে, ভালো মানুষ হবে। কিন্তু মাদক যদি হাতের কাছে থাকে, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে?”
আরেকজন বাসিন্দা জানান, মাদক ব্যবসা বন্ধ না হলে এলাকার শান্ত পরিবেশ চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে।
সাংবাদিকদের উপস্থিতি
পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন স্থানীয় সাংবাদিক মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম হিমেল এবং সহযোগী সাংবাদিক মোঃ ফরহাদ হোসেন। তারা ঘটনার বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করেন এবং স্থানীয়দের বক্তব্য সংগ্রহ করেন। সাংবাদিকরা জানান, মাদকবিরোধী এই উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান হওয়া জরুরি।
আইনগত দিক ও প্রশাসনের ভূমিকা
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে অবৈধভাবে মদ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে মাদক বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি আরও কঠোর হওয়ার বিধান রয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত প্রশাসনিক তদন্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এলাকাবাসী দাবি করেছেন, তারা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করবেন। তারা চান, শুধু এই একটি ঘটনা নয়—পুরো এলাকায় যেন মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়।
সামাজিক আন্দোলনের দাবি
স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, শুধু পুলিশি অভিযানই যথেষ্ট নয়। পরিবার, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মাদক নির্মূলে সচেতনতা বৃদ্ধি, কিশোরদের খেলাধুলা ও শিক্ষামুখী কার্যক্রমে যুক্ত করা জরুরি বলে তারা মত দেন।
উপসংহার
নাটোরের বড়াইগ্রামের এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করে, গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গাতেই মাদক একটি বড় সামাজিক সংকট। অভিযোগ সত্য হলে অঞ্জলী মাহাতোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। একই সঙ্গে তারা প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে যেন নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
এলাকাবাসীর একটাই প্রত্যাশা—আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে দোষীরা শাস্তি পাক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি নিরাপদ, মাদকমুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাক।
প্রতিনিধির মন্তব্য:
মাদক শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি একটি সমাজঘাতী ব্যাধি। মাদক ব্যবসা ও সেবনের কারণে আমাদের তরুণ সমাজ ধ্বংসের পথে যাচ্ছে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই ভয়াবহ আগ্রাসন রোধ করা সম্ভব নয়। মাদকবিরোধী অভিযানে কোনো আপস নয়—আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
