নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলহাজ্ব মকবুল হোসেন কলেজ গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি ও সহিংসতার অভিযোগে চরম সংকটে পড়েছে। প্রায় ৩২ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি একসময় সুনাম অর্জন করলেও বর্তমানে তার অস্তিত্বই হুমকির মুখে।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় কলেজে একাধিক একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়। বসিলায় দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে একটি ৮ তলা ভবনের নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং একটি ১০ তলা ভবনের কাজ চলমান রয়েছে। তবে বর্তমান প্রশাসনিক সংকটের কারণে এসব স্থাপনা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মেজবা-উল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যান ছাড়াই কলেজের পুরনো অবকাঠামো ভাঙচুর করা হয়। এতে শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা কমে গিয়ে পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই কক্ষে একাধিক শিক্ষক পাঠদান করতে বাধ্য হচ্ছেন, ফলে শিক্ষার মান নষ্ট হচ্ছে।
ভাঙচুর ও সংস্কারের নামে কলেজ ফান্ড থেকে লক্ষাধিক টাকা উত্তোলন এবং অপ্রয়োজনীয় সভা দেখিয়ে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে, যা সরকারি আর্থিক বিধিমালার পরিপন্থী। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি লঙ্ঘন করে জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে একজন নারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক অধ্যক্ষ রেজাউল করিমকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি তাঁকে নির্দোষ সাব্যস্ত করে পুনর্বহালের নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর করা হয়নি।
২৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনাকালে সর্বজ্যেষ্ঠ শিক্ষক মাহমুদ মোস্তফা আল মামুনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষককেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
এছাড়া দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরের বেশি সময়েও সভাপতি গভর্নিং বডির দাতা সদস্য, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও শিক্ষা বোর্ড প্রতিনিধিকে মনোনয়ন দেননি। ফলে কলেজটি একক ও স্বেচ্ছাচারীভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
এ অবস্থার বিরুদ্ধে এক অভিভাবক হাইকোর্টে রিট করলে (পিটিশন নং ১০৭০৩/২০২৫) সভাপতির বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ জারি হয়। অভিযোগ রয়েছে, স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে কলেজ ফান্ড থেকে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
এসব অনিয়মের ফলে গত এক বছরে কলেজের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। বসিলার দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে ৮ তলা ভবন সম্পন্ন হলেও শিক্ষার্থী সংকটে পাঠদান শুরু করা যাচ্ছে না। এতে শিক্ষক ও কর্মচারীদের চাকরি ও বেতন-ভাতা অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক সুমন বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রোজিনা আক্তার বলেন, সাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে হওয়া তদন্ত তারা মানেন না এবং পুনঃতদন্ত দাবি করেছেন।
গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মেজবা-উল ইসলাম অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, তিনি তদন্ত প্রতিবেদন দপ্তরে জমা দিয়েছেন।
কলেজ সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর দাবি—শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় অবিলম্বে বর্তমান সভাপতিকে অপসারণ করে একজন যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হোক।
