মোঃ রাসেল আহমেদ
সহ-কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষক, বাংলাদেশ সাংবাদিক ঐক্য পরিষদ
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যম পরস্পরের পরিপূরক শক্তি। রাজনৈতিক কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ কিংবা সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের উপস্থিতি তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক আয়োজনে সাংবাদিকদের জন্য একসময় প্রচলিত ও স্বীকৃত ‘প্রেস টেবিল’ বা নির্ধারিত মিডিয়া জোন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এই অব্যবস্থাপনা আজ সাংবাদিকতার জন্য এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে।
প্রেস টেবিল কোনো সাধারণ বসার জায়গা নয়। এটি সাংবাদিকদের পেশাগত পরিচয়, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার প্রতীক। বর্তমানে অধিকাংশ রাজনৈতিক আয়োজনে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সংবাদকর্মীরা বাধ্য হচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড়ে, কখনো মঞ্চের একেবারে পাশে, আবার কখনো কর্মীদের সঙ্গে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে। এতে একদিকে সংবাদ সংগ্রহের পেশাদার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে একজন সাংবাদিকের নিরপেক্ষ অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
এ ধরনের বাস্তবতায় সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সংবাদ কাভারেজ করতে গিয়ে বিদ্বেষমূলক আচরণ, হেনস্তা এমনকি শারীরিক হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে একই সারিতে অবস্থানের কারণে অনেক সময় সাংবাদিকদের ছবি বা ভিডিও এমনভাবে ধারণ ও প্রচার করা হয়, যা পরবর্তীতে তাদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি স্থিরচিত্র বা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওই একজন সাংবাদিককে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য যথেষ্ট। বাস্তবে নিরপেক্ষ থেকেও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার দায় শেষ পর্যন্ত সাংবাদিককেই বহন করতে হয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি—শুধুমাত্র কোনো একটি ফ্রেমে উপস্থিত থাকার কারণে বহু সাংবাদিক হয়রানি, হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে এমন পরিস্থিতিতে পড়া শুধু একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্যও অশনিসংকেত।
রাজনৈতিক দলগুলোর আয়োজনে যদি সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট প্রেস টেবিল বা আলাদা মিডিয়া জোন নিশ্চিত করা হতো, তবে এসব ঝুঁকি অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হতো। এতে একদিকে সংবাদ সংগ্রহ হতো সুশৃঙ্খল ও পেশাদার পরিবেশে, অন্যদিকে সাংবাদিকদের দলীয় পরিচয়ের অপবাদ থেকেও মুক্ত রাখা যেত। প্রেস টেবিল সাংবাদিক ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি প্রয়োজনীয় পেশাদার দূরত্ব তৈরি করে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও দায়িত্বশীল রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখনো দেশে বহু দল নিরপেক্ষ সাংবাদিক রয়েছেন, যারা কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন বা সহযোগী শক্তির সঙ্গে যুক্ত না হয়েও সততা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাদের কাছে রাজনৈতিক আয়োজনে সাংবাদিকদের জন্য এই অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা গভীর হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাংবাদিকরা কোনো দলের মুখপাত্র নন, আবার শত্রুও নন। তারা সমাজের দর্পণ—যেখানে ভালো ও মন্দ উভয় চিত্রই প্রতিফলিত হয়। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বিনীত আহ্বান—গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ বা সুবিধাভোগী হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করুন। ভবিষ্যতের সকল রাজনৈতিক আয়োজনে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য আলাদা প্রেস টেবিল বা নির্ধারিত স্থান নিশ্চিত করুন।
সবশেষে বলা যায়, প্রেস টেবিল কোনো বিলাসিতা নয়—এটি সাংবাদিকতার ন্যূনতম অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করা মানেই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা, এবং একই সঙ্গে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা।
