মোঃ রাসেল আহমেদ, নেএকোণা প্রতিনিধিঃ
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় বিএনপির নাম ব্যবহার করে একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী চক্র দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ একটি ধর্ষণ মামলার তথ্য সংগ্রহে গিয়ে পাঁচজন সাংবাদিক ওই চক্রের হাতে অপহরণ, অবরুদ্ধ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, মঙ্গলবার (তারিখ উল্লেখযোগ্য) ঢাকার গাজীপুর সদরে দায়ের হওয়া একটি নারী নির্যাতন মামলার তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তাঁরা কেন্দুয়ায় গেলে স্থানীয় একটি কুচক্রী মহল কৌশলে তাঁদের বীরমোহন গ্রামের একটি তথাকথিত বিএনপি ওয়ার্ড কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁদের প্রায় ১২ ঘণ্টা আটকে রেখে মারধর করা হয়, মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এক সাংবাদিকের গলার চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা হলেন—
ঢাকায় কর্মরত দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশ পত্রিকার মাইনুল ইসলাম ইমন,
বিডি ক্রাইমস-এর গিয়াস উদ্দিন রানা,
বিবিসি নিউজ ২৪-এর নিজস্ব সংবাদদাতা তারেক রহমান ফয়সাল,
বাংলাদেশ সমাচার পত্রিকার কেন্দুয়া উপজেলা প্রতিনিধি কোহিনূর আলম
এবং দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশ পত্রিকার কেন্দুয়া প্রতিনিধি সালমান আহমেদ।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা নিজেদের বিএনপি ও যুবদলের নেতা পরিচয় দিয়ে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখায় এবং জোরপূর্বক কিছু কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করে। ক্যামেরা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
পরবর্তীতে সহকারী পুলিশ সুপার (কেন্দুয়া–আটপাড়া সার্কেল) গোলাম মোস্তফার নির্দেশে কেন্দুয়া থানা পুলিশের হস্তক্ষেপে সাংবাদিকদের উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় একজন পুলিশ সদস্য সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার জেরে হামলাকারীরা থানা জ্বালিয়ে দেওয়া বা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে কেন্দুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন।
অভিযুক্তদের নাম ও পরিচয়
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে রয়েছেন—
সান্দিকোনা ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি ওয়াসিম আকরাম খান,
যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম,
ওয়ার্ড বিএনপি নেতা সোহাগ মিয়া,
গন্ডা ইউনিয়ন যুবদল নেতা কামাল হোসেন,
বিএনপি নেতা অসীম,
এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি ও সাবেক ইউপি সদস্য রতন মিয়া ওসমানসহ আরও কয়েকজন।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই চক্রের বিরুদ্ধে মুখ খুললে প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে। তাঁদের দাবি, এদের গ্রেপ্তার করা হলে থানা লুটের অস্ত্র উদ্ধার সম্ভব।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর সাংবাদিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—
কেন্দুয়া থানাকে অবহিত করার পরও কীভাবে দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের এত দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ রাখা সম্ভব হলো?
পুলিশ পরে অভিযুক্তদের কোনো লিখিত অভিযোগ বা বৈধ প্রমাণ না পাওয়ায় সাংবাদিকদের থানায় নিয়ে গিয়ে সার্কেল পুলিশের নির্দেশে স্থানীয় এক সাংবাদিকের জিম্মায় মুক্তি দেয়।
সাংবাদিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর দেশজুড়ে সাংবাদিক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আসন্ন নির্বাচনী পরিবেশ চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাঁদের মতে, “সাংবাদিক বন্দি মানেই নির্বাচন বন্দি।”
প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রস্তুতি
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা থেকে গাজীপুর হয়ে কেন্দুয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক মানববন্ধনের প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয় এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া অনুসন্ধানী সাংবাদিক মহল অভিযুক্তদের অতীত অপরাধ, মামলা ও ওয়ারেন্ট সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
(চলবে…)
