রিপোর্টার-মাইনুল ইসলাম ইমন
নেত্রকোনায় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও ১২ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার অভিযোগ
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ঢাকায় কর্মরত একাধিক সাংবাদিককে প্রায় ১২ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। পরে সহকারী পুলিশ সুপার (কেন্দুয়া–আটপাড়া সার্কেল) গোলাম মোস্তফার নির্দেশে কেন্দুয়া থানা পুলিশের হস্তক্ষেপে তাঁদের উদ্ধার করা হয়।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা হলেন—
ঢাকায় কর্মরত প্রাণের বাংলাদেশ পত্রিকার মাইনুল ইসলাম ইমন,
বিডি ক্রাইমস–এর গিয়াস উদ্দিন রানা,
বিবিসি নিউজ ২৪-এর নিজস্ব সংবাদদাতা তারেক রহমান ফয়সাল,
বাংলাদেশ সমাচার পত্রিকার কেন্দুয়া উপজেলা প্রতিনিধি কোহিনূর আলম
এবং জাতীয় দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশ পত্রিকার কেন্দুয়া প্রতিনিধি সালমান আহমেদ ।
(প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট চারজন সাংবাদিক প্রত্যক্ষভাবে ভুক্তভোগী বলে জানিয়েছেন।)
পরিকল্পিতভাবে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী ড. রফিকুল ইসলাম হিলালীর সমর্থক একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে তাঁদের আটক করে। গাজীপুর সদরে দায়ের হওয়া একটি নারী নির্যাতন মামলার তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তাঁরা কেন্দুয়ায় গেলে তাঁদের বীরমোহন গ্রামের একটি বিএনপি ওয়ার্ড কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং প্রায় ১২ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়।
এ সময় সাংবাদিকদের মারধর করা হয়, ক্যামেরা ও গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং এক সাংবাদিকের গলার চেইন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি জোরপূর্বক কিছু কাগজপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—
কেন্দুয়া থানাকে অবহিত করার পরও পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের কীভাবে দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা অবরুদ্ধ রাখা সম্ভব হলো?
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের একত্রিত করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্তরা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ বা প্রমাণ দেখাতে পারেননি। এরপর পুলিশ সাংবাদিকদের থানায় নিয়ে যায় এবং সার্কেল পুলিশের নির্দেশনায় মুচলেকা দিয়ে স্থানীয় এক সাংবাদিকের জিম্মায় তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়।
অভিযুক্তদের নাম প্রকাশ
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের ভাষ্যমতে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে রয়েছেন—
সান্দিকোনা ও গন্ডা ইউনিয়নের কয়েকজন স্থানীয় বিএনপি ও যুবদল নেতা,
যার মধ্যে আছেন যুবদল নেতা মো. ওয়াসিম,
গন্ডা ইউনিয়ন যুবদল সভাপতি মোহাম্মদ কামাল হোসেন,
মো. স্বপন, মো. রনি, মোহাম্মদ আলমগীর,
অভিযোগকারী আনাসের ভাই মো. একরাম ও চাচাতো ভাই সুমন,
গন্ডা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান কল্যাণ,
এছাড়া ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি ও সাবেক ইউপি সদস্য রতন মিয়া ওসমান।
ভুক্তভোগীদের দাবি, হামলাকারীরা প্রকাশ্যে বলেন—
“১৭ বছর ধৈর্য ধরেছি, এখন সাংবাদিকদের সময় নেই। পুলিশ আমাদের এলাকায় এলে আমরা বেঁধে রাখি। ম্যাজিস্ট্রেটকেও পিটিয়েছি। অনুমতি ছাড়া এখানে সাংবাদিক তো দূরের কথা, তথ্য সংগ্রহও করা যাবে না। আমরা উপরের নির্দেশে কাজ করি।”
সাংবাদিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর দেশজুড়ে সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা সতর্ক করে বলেছেন,
এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জরুরি ব্যবস্থা না নেওয়া হলে নির্বাচনী সহিংসতা বাড়তে পারে এবং সুস্থ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাঁদের মতে, নেত্রকোনা জেলার আসনগুলো বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাংবাদিক বন্দি মানেই নির্বাচন বন্দি—এ অবস্থায় অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মদের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রস্তুতি
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা থেকে গাজীপুর হয়ে কেন্দুয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক মানববন্ধন কর্মসূচির প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি আগারগাঁওয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনের পরিকল্পনাও রয়েছে। স্থানীয় প্রেসক্লাব থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত ধারাবাহিক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে অনুসন্ধানী সাংবাদিক মহল ঘটনাটি নিয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতি শুরু করেছে।
