রওশন বাবু
বিশেষ প্রতিনিধি, রংপুরঃ
উত্তরাঞ্চলের রাজনীতিতে প্রতিহিংসার রাজনীতির চর্চা প্রথম শুরু করেছিলেন সাবেক এমপি আশিকুর রহমান, জাকির হোসেন সরকার ও রাশেক রহমান—এমন অভিযোগ এখন প্রকাশ্যে বলছেন খোদ আওয়ামী লীগেরই অনেক নেতা-কর্মী। স্থানীয়দের মতে, এই তিনজনের হাত ধরেই রাজনীতি নেমে আসে নোংরা ও সহিংস পর্যায়ে।
বিশেষ করে রাশেক রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে রাজনীতিকে ‘ডন কালচারে’ রূপ দেওয়ার অভিযোগ। হেলিকপ্টারে চলাফেরা, নারী শিল্পীদের নিয়ে কনসার্ট আয়োজন ও তাদের আবাসনের ব্যবস্থা, নিয়োগ বাণিজ্য—এসব নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা চলেছে। অভিযোগ রয়েছে, মিঠাপুকুর এলাকায় গ্রেফতার, গুম, এমনকি খুন পর্যন্ত সংঘটিত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে।
নিরীহ দলীয় কর্মীদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সাবেক ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীই দাবি করেন, বিগত ১৭ বছরে কেউই প্রকৃত অর্থে সরকারি চাকরি বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা পাননি। বরং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নাইট গার্ড, কেরানি কিংবা অফিস সহকারী পদে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি আরও হতাশাজনক। অভিযোগ রয়েছে, আশিকুর রহমান ও রাশেক রহমান পরিবারসহ বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করছেন, আর জাকির হোসেন সরকার রয়েছেন পলাতক। অথচ মাঠপর্যায়ের কর্মীরা পড়ে আছেন অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতায়।
আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীই আক্ষেপ করে বলেন, যেসব নেতার নির্দেশে সাধারণ মানুষকে ‘জামায়াত-শিবির’ তকমা দিয়ে পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করানো হয়েছিল, সেই নেতারাই আজ খোঁজ খবর নেন না। নেতারা নিরাপদ, আর কর্মীরা ঘরছাড়া—এটাই বাস্তবতা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মিঠাপুকুরে জামায়াত-শিবিরের ওপর যে মাত্রায় দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে, তার চার ভাগের এক ভাগ যদি উল্টোভাবে ঘটত, তাহলে অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হতো।
তৎকালীন সময়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশ কার্যত দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করেছে এবং মামলা বাণিজ্য চালু ছিল। এমনকি রাতের বেলায় কতজন জামায়াত-শিবির কর্মী গ্রেফতার করা হবে—সে বিষয়ে ‘কোটাও’ নির্ধারণ করা হতো।
বর্তমানে আবার নতুন করে সেই কোটা পদ্ধতিতে গ্রেফতার শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। আগে জামায়াত-শিবির ধরা হতো, এখন ধরা হচ্ছে আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীদের। অথচ বড় নেতারা, তথাকথিত ‘রাঘব-বোয়ালরা’, এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পেটের দায়ে যারা মিছিল-মিটিং করতেন, তারাই আজ গ্রেফতার হচ্ছেন—এমন অভিযোগ তুলে স্থানীয়রা দাবি করছেন, প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ হোক। রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, কিন্তু তার দায় যেন সাধারণ কর্মী ও নিরীহ মানুষের ওপর না পড়ে—এটাই এখন উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা।
