লোহাগাড়ার বিষাদগাথা নিথর বাবা-মায়ের পাশে অচেতন ছোট্ট আরাধ্য, জানেনা চিরতরে একা হয়ে গেল

মোঃ আবু সাইদ শওকত আলী,
ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধিঃ
কক্সবাজারের সোনালী বালুকায় আনন্দ খুঁজে ফেরার স্বপ্ন নিমেষে পরিণত হলো এক গভীর শোকের সাগরে। লোহাগাড়ার পিচঢালা পথে রচিত হলো এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি, কেড়ে নিল দিলীপ কুমার (৪০) ও তার স্ত্রী সাধনা রানীর (৩৫) প্রাণ। আর তাদের একমাত্র আদরের কন্যা, ছোট্ট আরাধ্য (৬), এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শীতল আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। নিষ্পাপ চোখে এখনো হয়তো লেগে আছে সমুদ্রের ঢেউয়ের ছবি, অথচ সে জানে না, যাদের হাত ধরে সে সৈকতে দৌঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিল, তারা আজ নিথর, চিরতরে নীরব।

আজ সকালে যখন ঝিনাইদহের মাটিতে দিলীপ ও সাধনার নিথর দেহ পাশাপাশি শায়িত, তখন তাদের কলিজার টুকরা আরাধ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে হাসপাতালের বিছানায়। তার ছোট্ট মন এখনো হয়তো বিশ্বাস করতে চাইছে, বাবা-মা কাছেই কোথাও আছেন, একটু পরেই এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন। কিন্তু বিধির নির্মম পরিহাস, সেই স্নেহস্পর্শ আর কোনোদিন অনুভব করবে না সে।

বুধবারের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শুধু দিলীপ আর সাধনাই নন, প্রাণ হারিয়েছেন আরও আটজন, যার মধ্যে ছিলেন সাধনার বড় ভাইও। আনন্দের যাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হলো কান্নার রোল আর আর্তনাদে। গুরুতর আহত অবস্থায় কোনোমতে বেঁচে আছেন আরাধ্য এবং তার মামাতো ভাই। কিন্তু ছোট্ট আরাধ্যর জগৎ তো জুড়ে ছিল শুধু তার বাবা আর মা। সেই জগৎ আজ ধূলিসাৎ।

দিলীপের বাল্যবন্ধু শোভন কুমার কাজলের কণ্ঠ বিষাদে ভারী। তিনি জানান, পরিবারে এখন আর কেউ নেই যে এই ছোট্ট মেয়েটির দায়িত্ব নেবে। দিলীপের বৃদ্ধ বাবা দুলাল বিশ্বাস, যার একমাত্র অবলম্বন ছিলেন তার ছেলে, আজ ভেঙে পড়েছেন। তিন বিধবা মেয়ের মধ্যে দুজন থাকেন সুদূর পশ্চিমবঙ্গে, অন্যজনেরও আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। একই দুর্ঘটনায় আদরের নাতির মাতাকেও হারিয়েছেন দুলাল।

বৃদ্ধ দুলাল বিশ্বাস অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, তিনি নিজে চলৎশক্তিহীন, তবুও এই পৃথিবীতে এখন তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ এই ছোট্ট নাতনি। তিনি যেভাবেই হোক আরাধ্যকে আগলে রাখবেন, তার বাবার-মায়ের অভাব পূরণ করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু কে জানে, ছোট্ট আরাধ্যর কোমল হৃদয় এই অপূরণীয় ক্ষতি কীভাবে সামলে উঠবে?

লোহাগাড়ার এই দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, একটি ছোট্ট মেয়ের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চিত করে তুলেছে। যে বয়সে তার হেসেখেলে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সে তাকে লড়তে হচ্ছে জীবন-মৃত্যুর কঠিন সংগ্রামে। আর যখন সে চোখ মেলবে, তখন জানতে পারবে তার মাথার ওপর থেকে চিরতরে সরে গেছে বাবা-মায়ের স্নেহময় ছায়া। এই নির্মম সত্য তার ছোট্ট মনে কতটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করবে, তা হয়তো কারোরই জানা নেই। এই মুহূর্তে একটাই প্রার্থনা, ছোট্ট আরাধ্য যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে এবং তার অসহায় দাদু যেন তাকে একটু হলেও ভালোবাসার উষ্ণতা দিতে পারেন। লোহাগাড়ার এই বিষাদগাথা যেন আর কোনো শিশুর জীবনে না আসে।